নারী মুক্তিযোদ্ধারা আজ কোথায়?
স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও, বহু মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় রয়ে গেছে পর্দার আড়ালে। যাদের বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশে বসবাসের সুযোগ অর্জন করেছি, নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের অনেকের পরিচয় রয়ে গেছে অজানা। একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা শুরু করে এদেশের সকল নারী ও পুরুষ। পরে সে স্বপ্নকে পূর্ণ করতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ব্যাপক। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকাকে অনেক সময় কম মূল্যায়ন করা হয়। সে সময় বহু নারী অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। অনেক নারী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে রান্নার কাজে, চিকিৎসক বা নার্স হিসেবে সেবার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী হামলা করলে তাদের জীবন হারানোর আশঙ্কা মুক্তিযোদ্ধাদের সমপরিমাণই ছিল। জীবন হারানোর ভয় থাকা সত্ত্বেও নারীরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার নিয়েই, যেন আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেতে পারি। আজ তাদের অনেকেই বিভিন্ন গ্রামে কঠিন জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত এবং তাদের জীবনের এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের পরিচয় অনেকের কাছেই অজ্ঞাত।
শুধু সশস্ত্র যুদ্ধ বা ক্যাম্পে সহায়তা নয়, যেসব নারী নিজেদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের অস্ত্র আনতে সাহায্য করেছেন, বিভিন্ন ক্যাম্পে অস্ত্র ও তথ্য সরবরাহ করার দায়িত্ব পালন করেছেন, যুদ্ধে তাদের ভূমিকাকে ছোট করে দেখা চলে না। তাদের এ সহায়তা মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধজয়ে সাহায্য করেছে এবং তারাও মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পাওয়ার অধিকার রাখেন। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য একাত্তরে এই নারীরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন, আজ দেশ কি তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারছে?
সে সময় যেসব নারী সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের একজন শিরীন বানু। বাড়ি পাবনা। সে সময় তিনি এডওয়ার্ড কলেজে বাংলায় অনার্স পড়ছিলেন। তখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য অস্ত্র চালনার ট্রেনিং নেন। ভারতের সহযোগিতায় নারীদের জন্য একটি ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল, এর দায়িত্বে ছিলেন সাজেদুর চৌধুরী। সেখানে প্রথম ব্যাচে তিনি ট্রেনিং প্রাপ্ত হন। তার সাথে ট্রেনিং নেয়া নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৩৪। তিনি থ্রি নট থ্রি রাইফেলসহ অনেক ধরনের অস্ত্র চালান। পাকিস্তানি সেনাদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন।
এ রকম আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বরিশালের আলমতাজ বেগম ছবি। একাত্তরে ক্লাস নাইনে পড়তেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের এ দেশ থেকে বিতাড়িত করে একটি স্বাধীন দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে। মনিকা, বীথিকা রায়, রেবা, রেখা, নূরজাহানসহ বহু নারী তার সাথে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে গিয়ে এ নারীরা তাদের সাথে অংশগ্রহণকারী পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সমমর্যাদা লাভ করেন। নারী ও পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে দেশকে জয়লাভের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
কষ্টকর হলেও সত্য, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারীরা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সমাদৃত হলেও পরবর্তীকালে তাদের অনেকের জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ বোঝা। তাদের অনেকের বিয়ে ও ঘর-সংসার করার পথে সমস্যা দেখা দেয়।
অনেক সহযোদ্ধাও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিয়ে করতে রাজি ছিলেন না। যারা বিয়ে করে সংসার শুরু করেন, বিয়ের পর তাদের অনেকের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণের কাহিনি হয়ে যায় নিষিদ্ধ। তাদের গৃহবধূ হিসেবে সাধারণ নারীর মতোই ঘরের চার দেয়ালের ভেতর গৃহস্থালি কাজে নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়োজিত রাখতে হয়। স্বামীর ইচ্ছায় জীবন অতিবাহিত করতে হয়। যে নারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ দেশ স্বাধীন করতে এগিয়ে এসেছেন, পরবর্তী জীবনে তার সে অংশগ্রহণ যদি দোষ হয়ে দাঁড়ায়, তবে লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতার অর্থ কী দাঁড়ায়?
কে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments